অফিস এবং ব্যক্তিগত জীবনের সীমারেখা (Boundaries) বর্তমান কর্পোরেট কালচারে ক্রমশ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। অনেক সময়ই আমরা বুঝতে পারি না কখন পেশাগত দায়িত্ব আমাদের একান্ত ব্যক্তিগত মুহূর্তে হানা দিচ্ছে।
আপনার বস বা অফিস কি আপনার 'ব্যক্তিগত সময়' (Me-time) কেড়ে নিচ্ছে? এই বিষয়টি নিয়ে একটি আকর্ষণীয় এবং প্রফেশনাল আলোচনা নিচে তুলে ধরা হলো:
🚨 পরিস্থিতির শিকার: যখন অফিসই সব, জীবন তুচ্ছ
আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে আমরা ২৪/৭ কানেক্টেড। কিন্তু এর একটি নেতিবাচক দিক হলো—অফিস থেকে বের হওয়ার পরেও মানসিকবাবে অফিসের ভেতরেই থাকা। ডিনারের টেবিলে বসের মেসেজ বা ছুটির দিনে 'আর্জেন্ট' মেইল—এগুলো এখন খুব সাধারণ ঘটনা। কিন্তু এটি সাধারণ হলেও মোটেই স্বাস্থ্যকর নয়।
লক্ষণগুলো খেয়াল করুন:
🔸অসময়ে যোগাযোগ: অফিস সময়ের বাইরে বা ছুটির দিনে নিয়মিত ফোন বা মেসেজ আসা।
🔸তাৎক্ষণিক উত্তরের প্রত্যাশা: বস আশা করেন আপনি রাত ১০টাতেও ইমেইলের রিপ্লাই দেবেন।
🔸অপরাধবোধ: ছুটি বা বিশ্রামের সময় ফোন সাইলেন্ট রাখতে ভয় বা অপরাধবোধ কাজ করা।
🔸মাইক্রো-ম্যানেজমেন্ট: প্রতি মুহূর্তে কাজের আপডেট চাওয়া, যা আপনার মানসিক শান্তি নষ্ট করে।
_ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _
এর প্রভাব: কেন এটি বিপজ্জনক?
আপনার ব্যক্তিগত সময় কেড়ে নেওয়া কেবল আপনার 'মুড' খারাপ করে না, এটি সুদূরপ্রসারী ক্ষতি করে:
১. বার্নআউট (Burnout): বিশ্রাম না পেলে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমে যায়। ফলে দীর্ঘমেয়াদে আপনার কাজের মান (Productivity) খারাপ হতে বাধ্য।
২. পারিবারিক দূরত্ব: পরিবারের সদস্যদের সময় না দিলে সম্পর্কে ফাটল ধরে, যা মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়।
৩. স্বাস্থ্যঝুঁকি: সবসময় 'অন' থাকার মানসিক চাপ অনিদ্রা, উচ্চ রক্তচাপ এবং দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তির কারণ হতে পারে।
_ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _
সমাধান: প্রফেশনাল বাউন্ডারি তৈরি করবেন যেভাবে
বসকে সরাসরি "না" বলা কঠিন হতে পারে, কিন্তু কৌশলী হয়ে নিজের সময় রক্ষা করা সম্ভব। এখানে কিছু প্রফেশনাল উপায় দেওয়া হলো:
১. প্রত্যাশা পরিষ্কার করুন (Set Clear Expectations)
চাকরিতে যোগ দেওয়ার শুরুতে বা কোনো নতুন প্রজেক্টের আগে বসের সাথে আলোচনা করুন। বিনয়ের সাথে জানান, "আমি অফিস টাইমে আমার সর্বোচ্চটা দিয়ে কাজ করব, যাতে অফিস সময়ের পরে আমাকে কাজ নিয়ে ভাবতে না হয়।"
২. ডিজিটাল ডিটক্স প্র্যাকটিস করুন
অফিস থেকে বের হওয়ার পর ইমেইল নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন। যদি খুব জরুরি কিছু না হয়, তবে পরদিন সকালে উত্তর দিন। ধীরে ধীরে বস এবং সহকর্মীরা আপনার এই রুটিনে অভ্যস্ত হয়ে যাবে।
৩. 'না' বলার শিল্প (The Art of Saying No)
বস যদি অসময়ে কাজ দেন, তবে সরাসরি না না বলে বিকল্প প্রস্তাব দিন।
❌ ভুল: "আমি এখন এটা পারব না।"
✔ সঠিক: "আমি বিষয়টি দেখেছি। এখন যেহেতু আমি বাইরে আছি, কাল সকালে অফিসে পৌঁছেই এটি সবার আগে শেষ করে আপনাকে জানাব।"
৪. নিজের ভ্যালু বোঝান
বসকে বোঝান যে, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিলে আপনি পরের দিন দ্বিগুণ উৎসাহে কাজ করতে পারেন। অর্থাৎ, আপনার বিশ্রাম কোম্পানির জন্যই লাভজনক।
_ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _ _
একজন ভালো লিডার বা বস সবসময় কর্মীর মানসিক স্বাস্থ্য এবং ব্যক্তিগত সময়ের কদর করেন। যদি আপনার বস নিয়মিত আপনার ব্যক্তিগত সময় কেড়ে নেন এবং কোনোভাবেই এটি পরিবর্তন করা না যায়, তবে বিষয়টি নিয়ে এইচআর (HR)-এর সাথে কথা বলা বা নতুন সুযোগের সন্ধান করা প্রয়োজন হতে পারে।
দিন শেষে, কাজ জীবনের একটি অংশ মাত্র—পুরো জীবন নয়।

Post a Comment